প্রকাশিত: সকাল ৮ টা ৪৩ মিনিট, ০৭ জুন ২০১৭, বুধবার | আপডেট: সকাল ৮ টা ৪৩ মিনিট, ০৭ জুন ২০১৭, বুধবার
দেওয়ান সামছুর রহমান
একটি অতি প্রচলিত প্রবাদ হলো ‘মাছে-ভাতে বাঙালী’। প্রবাদটি সকলের জানা হলেও আবার এটাও সবার এখন ভালো অভিজ্ঞতা যে মাছের বাজারের মাঝে দিয়ে কারো মাথা ঠিক রেখে মেপে চলা কঠিন হয়ে যায়। কবির কন্ঠেও শোনা যায়-‘মনের ভূলে কেউ কখনো মাছের বাজারে গেলে/ দাম শুনে তার চোখ চরক গাছ পাক ধরে কাঁচা চুলে।’ তারপরও আমরা বাঙালী, আমাদের মাছ খেতেই হবে

ফলে আমাদের বাজেটের একটা সিংহ ভাগ মাছের জন্য বরাদ্দ রাখতে হয় সব সময়ই। বর্তমানে মাছের এত আকাল হলেও এক সময় কিন্তু এরকম অবস্থা ছিলনা। নদীনালা, খালবিলে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। বাপ-চাচা, দাদা-নানা কিংবা এখনো যে সকল বয়স্ক ব্যাক্তিরা বেঁচে আছেন তাদের মুখে সেই সব দিনের কথা শুনলে রূপকথার মতো মনে হয়। তখনকার দিনে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত যা ছিল সস্তা ও সহজলভ্য। কিন্তু বর্তমানে জনসংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় এবং খালবিল ভরাট হয়ে যাওয়া, সেই সাথে নির্বিচারে মাছ নিধনের ফলে মুক্ত জলাশয়ে আর প্রচুর মাছ পাওয়া যাচ্ছেনা। এ অভাবকে দূর করার জন্য বর্তমানে চাষযোগ্য মাছের আবাদ বেড়ে যাচ্ছে এবং দেশী বিদেশী যেকোন ধরনের চাষের মাছ দিয়ে হলেও আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় আমিষের অভাব পূরনের চেষ্টা করছি।

জনসংখ্যার তুলনায় মাছের যোগান কম হলেও দেশের একটা বৃহৎ জনগোষ্ঠি মাছের উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। মাছ ধরা কিংবা মাছ বিক্রি করার মাধ্যমে তারা সারা বছর ব্যাপী তাদের জীবন নির্বাহ করে থাকে। আবার কেউ কেউ মৌসুমী মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত থাকে, কেউবা শখের বশেও মাছ ধরে থাকে। কেউ অন্য কাজের পাশাপাশি নিজেদের খাওয়ার উপযোগি মাছ ধরে থাকে। যে যেপ্রয়োজনেই মাছ ধরুক না কেন, মাছ ধরার কিছু কৌশল তাকে অবশ্যই জানতে হয়। গ্রামে একটা প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে যে আম কুড়ানো আর মাছ ধরা হলো নেশার মতো। ফলে কারো এ নেশা পেয়ে বসলে তাকে নিয়মিতই তা করতে হয়।
বর্ষাকালে গ্রামবাংলার চিরায়ত দৃশ্যের একটা সাধারণ রূপ হলো মাছ ধরার চিত্র। কোমরে রশি দিয়ে পাতিল কিংবা মাছ রাখার পাত্র বেঁেধ জালি কিংবা ঠেলি দিয়ে মাছ ধরার অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। কখনো বা সাথে একজন সহযোগি থাকে মাছের পাত্র রাখার জন্য। বর্ষার পানি যখন আসতে থাকে কিংবা যখন নেমে যায় তখন হাটু থেকে কোমর পানি পর্যন্ত এলাকা গুলোতে এভাবে মাছ ধরতে দেখা যায়। ধান ক্ষেতের আশেপাশে কিংবা খোলা বিস্তীর্ণ মাঠের জলাশয় এভাবে মাছ ধরার উপযুক্ত স্থান। আঞ্চলিক ভাষায় বাঁশের তৈরি ওছা নামক বিশেষ বস্তু দিয়েও এ প্রক্রিয়ায় মাছ ধরা হয়ে থাকে। সাধারণত পুটি, টেংরা, খলসা, বজুরী, মেনা,চান্দা প্রভৃতি মাছ এভাবে ধরা পড়ে থাকে। বর্ষার পানি আসতে শুরু করলে প্রচুর বৃষ্টি হলে মাছের আনাগোনা বেড়ে যায় যাকে গ্রামীণ ভাষায় মাছের মাইর বলা হয়। এ সময়টাতে নানাভাবে প্রচুর মাছ ধরা পড়ে। বিশেষ করে চোঙা, জোংড়া, চাই বা আলতার মাধ্যমে মাছ ধরা হয়ে থাকে। এ শব্দগুলো আঞ্চলিক শব্দ হওয়াতে একেক অঞ্চলে এরা একেক নামে পরিচিত। চোঙা হলো বাঁশের তৈরি, বিশেষ করে বরাক বাঁশ দিয়ে তৈরি করা। কেউবা সুপারি গাছের খোলস দিয়েও চোঙা তৈরি করে থাকে। বাঁশের এক গিট থেকে আরেক গিটের মধ্যবর্তী ফাঁপা স্থানটিকে কাজে লাগিয়ে এটি তৈরি করা হয়ে থাকে। বাঁশকে ফালি করে চাই, আলতা বা জোংড়া তৈরি করা হয়। চাই’এর মধ্যে আবার বিভিন্ন রকমের চাই রয়েছে যেমন দ্বার চাই। মাছ পাবার সম্ভাব্য স্থানগুলোতে পানিতে ডুব দিয়ে মাটির সাথে বিশেষ উপায়ে এদেরকে আটকিয়ে রাখা হয় এবং নির্ধারিত সময়ে উঠিয়ে আনা হয়। চোঙাতে বাইম, শিং, মাগুড় মাছ, চাই-তে চিংড়ি মাছ সহ নানা রকমের ছোট, বড় মাছ পাওয়া যায়।
মাছ ধরার পদ্বতি সমূহের মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত হলো জাল দিয়ে মাছ ধরা। বিভিন্ন রকমের জাল রয়েছে যেগুলো দিয়ে পুকুর, পুস্করিনী থেকে শুরু করে ছোট, বড় নদ-নদীতে মাছ ধরা হয়ে থাকে। এক রকমের জাল রয়েছে যাকে আঞ্চলিক ভাষায় কনি জাল বলা হয়ে থাকে। এক সময় দেখা যেত গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরে এ ধরনের জাল থাকতো। হাতের কনুই’র মাধ্যমে বিশেষ পদ্বতিতে পানিতে এ জাল ফেলা হয়। আরেক রকমের জাল রয়েছে যার নাম কোনা জাল। দীর্ঘ আকৃতির এ জাল সাধারণত নদীতে মাছ ধরার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। ছান্দি কিংবা চান্দি জাল কাচকি মাছের মতো ছোট মাছ ধরার জন্য ব্যবহৃৎ হয়। এ জালকেই আমরা কারেন্ট জাল হিসাবে চিনে থাকি। এছাড়াও মইয়া জাল, ঠেলি জাল সহ আরো নানা রকমের জালের সাহায্যে ছোট বড় নানা রকমের মাছ ধরা হয়ে থাকে। জালেরই আরেকটি বিশেষ প্রক্রিয়া হলো খড়া। জালকে চারদিক দিয়ে বাঁশ দিয়ে বিশেষ ভাবে এটি তৈরি করা হয়। একজন ব্যাক্তি জাল পানিতে ফেলার পর পা দিয়ে বাঁেশর একপ্রান্ত চেপে জাল উঠিয়ে নিয়ে আসে। এভাবে খড়ায় মাছ ধরা হয়।
কই, পুঁটি, বালিয়া, টেংরা সহ নানাবিধ মাছ ধরার জনপ্রিয় পদ্বতি হলো বড়শি। বড়শির মাথায় শুটকী, কেঁচো কিংবা আটার তৈরি মাছের খাবার আটকিয়ে মাছকে টোপ দেয়া হয়। রশির মধ্যে কাঠি (চুবাকাঠি) আটকিয়ে দেয়া হয়, মাছের টোপ বুঝার জন্য। আগে গ্রামের খুব কম ছেলেকেই পাওয়া যেত যারা কখনো বড়শি দিয়ে মাছ ধরেনি এমন। মাছ ধরা ঐ লোকটি কিংবা জেলেটি আলোর প্রতিসরণের সূত্র না জানলেও মাছ ধরার জন্য এ সূত্রের প্রয়োগ করে যে যন্ত্রের সাহায্যে মাছ ধরা হয় তাকে গ্রামে সাধারণত টেটা বলা হয়ে থাকে। এছাড়া চল বা বল্লমের সাহায্যেও এভাবে মাছ ধরা হয়ে থাকে। গভীর রাতে হ্যাজেক লাইট, হারিকেন বা টর্চের সাহায্যে নৌকায় করে এক দু’জন সহযোগি সাথে নিয়ে নিশ্চুপ ভাবে এ পদ্বতিতে মাছ ধরা হয়। তাছাড়া নদীর পাড় ঘেঁসে হেঁটেও এভাবে মাছ ধরা যায়। নদী যখন শান্তশিষ্ট, টেউহীন হয়ে যায় তখন নিরাক পদ্বতিতে মাছ ধরা হয়। অনেক অভিজ্ঞ ব্যাক্তিরা হাত দিয়েও যথেষ্ঠ মাছ ধরতে পারে। বিশেষ করে ছোট ছোট পুরনো পুকুরে কই, শিং, মাগুড় মাছ তারা হাত দিয়ে অনায়াসেই ধরতে পারে।
বেড় দিয়ে মাছ ধরার আরেকটি বিশেষ পদ্বতি যাকে স্থানীয় ভাষায় পাঞ্জা বলা হয়। বিভিন্ন গাছের বড় বড় ঢালপালা পানিতে দীর্ঘদিন ফেলে রেখে বাঁশ দিয়ে আটকিয়ে খাবার দিয়ে মাছকে টোপ দেয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় অনেক বড় বড় মাছ যেমন রুই, কাতলা, কালবাউশ, বোয়াল সহ নানাবিধ মাছ ধরা পড়ে। ছোট নদীগুলোতে চৈত্র বৈশাখ মাসে পানি কমে গেলে একদল লোক পলো নিয়ে নেমে পড়ে মাছ ধরতে। মাছ ধরার এ চিত্রটি বড়ই চমৎকার।
সর্বোপরি মাছ ধরাটাও একটি চমৎকার শিল্প। যে কেউ ইচ্ছা করলেই মাছ ধরতে পারেনা, মাছ ধরার জন্য কিছু কলা কৌশল জানতে হয়। নিয়ম মেনেও চলতে হয়। অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে একটি বড় বিষয়। যারা পেশাগত ভাবে মাছ ধে তাদেরকে আমরা জেলে বলে থাকি। অনেকে আবার হীন দৃষ্টিতেও দেখে থাকি। এটা মোটেও ঠিক নয়। তারা যে সমাজের কত বড় উপকার করছে তা অবশ্যই আমাদেও ভেবে দেখা উচিৎ সেই সাথে উচিৎ তাদের যোগ্য সম্মান দেয়া।
আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
৩০ জানুয়ারি ২০১৮
বিত্রমটি আই নিউজ ডেস্ক
অতি উৎসাহী অনুগামী কী কী করতে পারে? তা সিনেমার পর্দায় একাধিকবার উঠে এসেছে। তারকাদের জীবনেও এ ঘটনা নতুন নয়। ভালবাসার এই বিস্তারিত
৩০ জানুয়ারি ২০১৮
বিত্রমটি আই নিউজ ডেস্ক
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার সালামাবাদ ইউনিয়নের ভাউড়িরচর গ্রামের জামাল হোসেনের ছাগলের খামারে আগুন লেগে প্রায় দেড়শত ছাগলের মৃত্যু হয়েছে। রবিবার (২৮ জানুয়ারী) বিস্তারিত
৩০ জানুয়ারি ২০১৮
বিত্রমটি আই নিউজ ডেস্ক
তারুণ্যদীপ্ত নাট্যসংগঠন "নাট্যদল" টি.এস.সি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি বছর-ই সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদান স্বরুপ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সন্মাননা প্রদান করে থাকেl এরই ধারাবাহিকতায় বিস্তারিত
© স্বত্ব বিএমটিআইনিউজ ২০১৫ - ২০১৭
সম্পাদক :
মিঞা মুজিবুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক : শাহআলম শুভ
৩৭৩,দিলু রোড (তৃতীয় তলা)মগবাজার, ঢাকা-১২১৭
ফোন: ০২৯৩৪৯৩৭৩, ০১৯৩৫ ২২৬০৯৮
ইমেইল:bmtinews@gamil.com