মিঞা মুজিবুর রহমান:

এখানে আমি ‘ইবাদাত’ শব্দটির বিস্তারিত অর্থ আপনাদের সামনে পেশ করবো। এ শব্দটি সর্বসাধারণ মুসলমান প্রায়ই বলে থাকে কিন্তু এর প্রকৃত অর্থ অনেকেই জানে না। আল্লাহতাআলা কুরআন শরীফে বলেছেন:

 ‘‘আমি জ্বিন ও মানব জাতিকে কেবল আমারই ইবাদত ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি।’’ (সূরা আয যারিয়াত: ৫৬)

এ থেকে নিসন্দেহে বুঝা গেল যে মানুষের জন্ম, জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য আল্লাহ তাআলার ইবাদত এবং বন্দেগী ছাড়া আর কিছুই নয়। এখন আপনার সহজেই বুঝতে পারেন যে, ‘‘ইবাদত’’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ জেনে নেয়া আমাদের পক্ষে কতখানি জরুরি। এ শব্দটির অর্থ না জানলে যে মহান উদ্দেশ্যে আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে তা আপনি কিছুতেই লাভ করতে পারেন না। আর যে বস্তু তার উদ্দেশ্য লাভ করতে পারে না তা ব্যর্থ ও নিস্ফল হয়ে থাকে।

চিকিৎসক রোগীকে নিরাময় করতে না পারলে বলা হয় যে, সে চিকিৎসায় ব্যর্থ হয়েছে, কৃষক ভাল ফসল জন্মাতে না পারলে কৃষিকার্জে তার ব্যর্থতা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। তেমনি আপনারা যদি আপনাদের জীবনের উদ্দেশ্য লাভ অর্থ্যাৎ ইবাদাত করতে না পারেন তবে বলতে হবে যে,আপনাদের জীবন ব্যর্থ হয়েছে। এজন্যই আমি আশা করি আপনারা এ ‘ইবাদাত’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ ও তাৎপর্য জানার জন্য বিশেষ মনোযোগী হবেন এবং তা আপনাদের  হৃদয়- মগজে বদ্ধমূল করে নিবেন। কারণ মানব জীবনের সাফল্য ও ব্যর্থতা এরই ওপর একান্তভাবে নির্ভর করে।

ইবাদাত শব্দটি আরবি ‘আবদ’ হতে উদ্ভূত হয়েছে। ‘আবদ’ অর্থ দাস ও গোলাম। অতএব ‘ইবাদাত’ শব্দের অর্থ বন্দেগী ও গোলামী করা। যে ব্যক্তি অন্যের দাস সে যদি তার মনিবের সমীপে একান্ত অনুগত হয়ে থাকে এবং তার সাথে ঠিক ভৃত্যের ন্যায় ব্যবহার করে, তবে একে বলা হয় বন্দেগী ও ইবাদাত।পক্ষান্তরে কেউ যদি কারো চাকর হয় এবং মনিবের কাছ থেকে পুরোপুরি বেতন আদায় করে, কিন্তু তবুও সে ঠিক চাকরের ন্যায় কাজ না করে তবে বলতে হবে যে, সে নাফরমানী ও বিদ্রোহ করছে। আসলেই একে অকৃজ্ঞতা বলাই বাঞ্ছনীয়। তাই সর্ব প্রথম আপনাকে জানতে হবে, মনিবের সামনে ‘চাকরের’ ন্যায় কাজ করা এবং তার সমীপে আনুগত্য প্রকাশ করার উপায় কি হতে পারে।

 বান্দা বা চাকরকে প্রথমত মনিবকে ‘প্রভু’ বলে স্বীকার করতে হবে এবং মনে করতে হবে যে, যিনি আমার মালিক, যিনি আমাকে দৈনন্দিন রুজি দান করেন  এবং যিনি আমার হেফাজত ও রক্ষণাবেক্ষণ করেন তাঁরই অনুগত হওয়া আমার কর্তব্য। তিনি ছাড়া অন্য কেউ আনুগত্য লাভের অধিকারী নয়। সকল সময় মনিবের আনুগত্য করা, তার হুকুম পালন করা, তাঁর অনুবর্তিতা মুহুর্তের জন্যও পরিত্যাগ না করা, মনিবের বিরুদ্ধে মনে কোন কথার স্থান না দেয়া এবং অন্য কারো কথা পালন না করাই বান্দাহর দ্বিতীয় কর্তব্য। গোলাম সব সমই গোলাম; তার একথা বলার কোন অধিকার নেই যে, আমি মনিবের এ আদেশ মানব আর অমুক আদেশ মানবো না। কিংবা আমি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মনিবের গোলাম আর অন্যান্য সময় আমি তার গোলামী হতে সম্পূর্ন আযাদ ও মুক্ত।

মনিবের প্রতি সম্মান সম্ভ্রম প্রদর্শন এবং তার সমীপে আদব রক্ষা করে চলা বান্দার তৃতীয় কাজ। আদব ও সম্মান প্রকাশের যে পন্থা মনিব নির্দিষ্ট করে  দেবেন তাই অনুসরণ করা, সালাম দেয়ার জন্য মনিব যে সময় নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন সেই সময়ে নিশ্চিতরূপে উপস্থিত হওয়া এবং মনিবের আনুগত্য ও দাসত্ব স্বীকারের নিজের প্রতিজ্ঞা ও আন্তরিক নিষ্ঠা প্রমাণ করা একান্ত আবশ্যক।

এ তিনটি প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে যে কার্যটি সম্পন্ন হয় আরবী পরিভাষায় তাকেই বলে ‘ইবাদাত’। প্রথমত, মনিবের দাসত্ব স্বীকার, দ্বিতীয়ত, মনিবের আনুগত্য এবং তৃতীয়ত, মনিবের সম্মান ও সম্ভ্রব রক্ষা করা।

আল্লাহ তাআলা বলেছেন

এর প্রকৃত মর্ম হচ্ছে:আল্লাহ তাআলা  জ্বিন ও মানব জাতিকে একমাত্র এ উদেশ্যে সৃষ্টি করেছেন যে, তারা কেবল আল্লাহ তাআলারই দাসত্ব করবে, অন্য কারো নয়, কেবল আল্লাহর হুকুম পালন করবে, এছাড়া অন্য কারো হুকুম অনুসরন করবে না এবং কেবল তারই সামনে সম্মান ও সম্ভ্রম প্রকাশের জন্য মাথা নত করবে, অন্য কারো সামনে নয়। এই তিনটি জিনিসকে আল্লাহ তাআলা বুঝিয়েছেন ব্যপক অর্থবোধক শব্দ ‘ইবাদাত’ দ্বারা। যেসব আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইবাদাতের নির্দেশ দিয়েছেন তার অর্থ এটাই।আমাদের শেষ নবী এবং তার পূর্ববর্তী আম্বিয়ায়ে কেরামের যাবতীয় শিক্ষার সারকথা হচ্ছে:‘‘আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করো না’’অর্থাৎ দাসত্ব ও আনুগত্য লাভের যোগ্য সারা জাহানে একজনই মাত্র বাদশা আছেন-তিনি হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা অনুসরনযোগ্য মাত্র একটি বিধান বা আইন আছে- তাহলো আল্লাহর দেয়া জীবনব্যবস্থা এবং একটি মাত্র সত্তাই আছে,যার পূজা -উপাসনা-আরাধনা করা যেতে পারে। আর সেই সত্তাই হচ্ছে একমাত্র আল্লাহ।

ইবাদাত শব্দের এ অর্থ আপনি স্বরণ রাখুন এবং আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে থাকুন। একটি  চাকর যদি মনিবের নির্ধারিত কর্তব্য পালন না করে বরং তার সামনে কেবল হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে, লক্ষ্যবার তার নাম জপে, তবে এ চাকরটি সম্পর্কে আপনি কি বলবেন? মনিব তাকে অন্যান্য মানুষের প্রাপ্য আদায় করতে বলেন। কিন্তু সে কেবল সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে মনিবের সামনে মাথা নত করে দশবার সালাম করে এবং আবার হাত বেঁধে দাঁড়ায়। মনিব তাকে অনিষ্টকর কাজগুলো বন্ধ করতে আদেশ করেন। কিন্তু সে সেখান থেকে একটুও নড়ে না। বরং সে কেবল সিজদা করতে থাকেন। মনিব তাকে চোরের হাত কাটতে বলেন। কিন্তু  সে দাঁড়িয়ে থাকেন সুললিত কন্ঠে বিশবার পড়তে বা উচ্চারণ করতে থাকে-‘চোরের হাত কাট’ কিন্তু সে একবারও এমন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জনর‌্য চেষ্টা করে না যার অধীন চোরের হাত কাটা সম্ভব হবে। এমন চাকর সম্পর্কে কি মন্তব্য করবেন? আপনি কি বলতে পারেন যে, সে প্রকৃত পক্ষে মনিবের বন্দেগী ও ইবাদাত করছে? আপনার কোন চাকর  এরূপ করলে আপনি তাকে কি বলবেন তা আমি জানি না, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, আল্লাহর যে চাকর  এরূপ আচরণ করে তাকে আপনি ‘বড় আবেদ’(ইবাদাতকারী), বুযর্গ ইত্যাতি) নামে অভিহিত করেন। এরা সকাল হতে সন্ধা পর্যন্ত কুরআন শরীফে আল্লাহ তাআলার কত হুকুম পাঠ করে, কিন্তু সেগুলো পালন করার এবং কাজে পরিণিত করার জন্য একটু চেষ্টাও করে না। বরং কেবল নফলের পর নফল পড়তে থাকে, আল্লাহর নামে হাজার দানা তাসবীহ জপতে  থাকে এবং মধুর কন্ঠে কুরআন মাজীদ তেলাওয়াত করতে থাকে।আপনি তার এ ধরণের কার্যাবলি দেখেন, আর বিস্মিত হয়ে বলেন:‘ওহ! লোকটা কত বড় আবেদ আর কত বড় পরহেযগার।’ আপনাদের এ ধারণার মূল কারণ এই যে আপনারা ‘ইবাদাত’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ মোটেই জানেন না। হ্যা,নামাজ রোজা হজ্জ যাকাত সহ সমস্ত ফরজ ওয়াজেব পালন করার  পর মানুষের হক আদায় করার পর পরিবার প্রতিবেশী সমাজ রাষ্ট্র  এবং মানব জাতি তথা সৃষ্টির সব হক আদায়  করর ফাকে ফাকে নফল ইবাদাত তসবিহ তাহলিল  জিকির আজগার  মেরাকাবা  মোসাহেদা  সবই করবেন বরং করলে ভাল এবং খুব বেশি ভাল কাজ এগুলি। আল্লাহর হুকুম পালন না করে হুকুমের  বিরোধীতা করে এগুলি করলে কোন ফায়দা হবে না। বরং মহান আল্লাহ আপনাকে  ধোকাবাজ বলে দরবার থেকে তাড়িয়ে দিবেন। সবাইকে ধোকা দেওয়া যেতে পারে কিন্তু আলেমুল গায়েব আল্লাহকে ধোকা দেওয়া সম্ভব নয়।

আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
২০ জানুয়ারি ২০১৮
বিত্রমটি আই নিউজ ডেস্ক
একটা নদী উপহার পেয়েছি রটনার মত ছড়িয়ে যাচ্ছে , গুজব না সত্যি ! আমার একটা নদী আছে যদিও আমি নদী চাইনি চেয়েছি চাঁদ , তবু নদীই পেলাম বিস্তারিত
২০ জানুয়ারি ২০১৮
বিত্রমটি আই নিউজ ডেস্ক
আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের এক গৃহবধু দেবর ও ভাশুরের নির্যাতন, হয়রানিমূলক মামলাসহ বিভিন্ন কুৎসার হাত থেকে নিজের পরিবারের সদস্যদের বাঁচাতে সংবাদ সম্মেলন বিস্তারিত
২০ জানুয়ারি ২০১৮
বিত্রমটি আই নিউজ ডেস্ক
ড্রিম ডিভাইজারের নিজস্ব উদ্ভাবিত স্বপ্ন- সুশিক্ষা- সুযোগ মডেলে সুশিক্ষায় স্বপ্নবুননে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে। সুশিক্ষায় স্বপ্নবুননে বিশেষ আয়োজন হচ্ছে স্বপ্ন-আড্ডা। স্বপ্ন আড্ডার বিস্তারিত
© স্বত্ব বিএমটিআইনিউজ ২০১৫ - ২০১৭
সম্পাদক :
মিঞা মুজিবুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক : শাহআলম শুভ
৩৭৩,দিলু রোড (তৃতীয় তলা)মগবাজার, ঢাকা-১২১৭
ফোন: ০২৯৩৪৯৩৭৩, ০১৯৩৫ ২২৬০৯৮
ইমেইল:bmtinews@gamil.com