মিঞা মুজিবুর রহমান

বাংলাদেশের পরিচিতি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে। এ দেশের মানুষ স্ব-স্ব ধর্মে নিষ্ঠাবান হওয়ায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে তারা অনুকরণীয় আদর্শ বলে ভাবে। দুনিয়ার সব ধর্মই শান্তির কথা বলে। সব ধর্ম অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আদর্শকে অনুকরণীয় বলে ভাবে। বাংলাদেশের মানুষ ধার্মিক বলেই ভিন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহনশীলতার আদর্শ এ দেশে মূর্তমান। দেশের সিংহভাগ মানুষ ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেও বকধার্মিক ও কাণ্ডজ্ঞানহীনদের কারণে কখনো কখনো তাদের সুনামও কণ্টকিত হয়ে ওঠে। যেমনটি হয়েছে কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু এলাকায়। দুই বছর আগে বকধার্মিক মতলববাজদের উš§ত্ততার শিকার হয়েছিল এসব এলাকার কিছু বৌদ্ধধর্মীয় স্থাপনা। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বেশ কিছু বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে হিংসাত্মদক চেতনার ঘৃণ্যজীবেরা। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেশের ঐতিহ্যের অংশীদার বেশ কিছু মূল্যবান স্থাপনাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা ক্ষতবিক্ষত করেছে দেশের গণমানুষের অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তিকে।

একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় কারনে সাম্প্রদায়িকতার ব্যাপকতা লক্ষনীয়। মুলত  বৃটিশরা এর বীজ বপন করে গেছে। বিশেষ করে হিন্দু-মুসলমান বড় দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে এই সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় চেতনা জাগিয়ে দিয়ে কলহের পথ তৈরি করে দিয়ে গেছে তারা। এর ফলে ১৯৬৪ সালে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জের আদমজীসহ বিভিন্ন এলাকায় মুসলিম ও হিন্দুদের মাঝে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে যখন বিভিন্ন স্থানে বাঙালি ও বিহারীদের মাঝে সংঘর্ষের ঘটনা শুরু হয়। দাঙ্গায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছিলো এবং অবাধে হয়েছিলো লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ। দাঙ্গায় গৃহহীন হয়ে পড়ে পড়েছিলো শত শত মানুষ। এ ঘটনায় অনেকে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। যা আমাদের দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনেনি।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়, ১৯৯২ সালের ৬ ই ডিসেম্বর ভেঙ্গে ফেলা হয় ভারতের বাবরি মসজিদ। যা মুসলমানদের কাছে বড় কষ্টের। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার ফলে সৃষ্ট্রিয় দাঙ্গায় মৃত্যু হয় অসংখ্য মানুষের। ভারতে মসজিদ ভাঙ্গা হয়েছে দেখে আমরা মন্দির ভাংবো তা হয় না। কারন ইসলাম শান্তি-সম্প্রীতি ও মানবতার ধর্ম। কোনরূপ সহিংসতা, বিবাদ-বিসংবাদের স্থান ইসলামে নেই। ন্যূনতম শান্তি-শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বিনষ্ট হয় এমন আচরণকেও ইসলাম প্রশ্রয় দেয় না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন ‘ফিৎনা-ফাসাদ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও কঠিন অপরাধ।’ (বাকারা-১৯১)। ‘পৃথিবীতে শান্তি স্থাপনের পর তাতে ফাসাদ সৃষ্টি করো না।’ (আরাফ-৫৬)। অমুসলিমদের প্রতিও কোন অন্যায় আচরণ ইসলাম অনুমোদন করে না। শান্তি-সৌহার্দ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুরক্ষায় ইসলামের রয়েছে শাশ্বত আদর্শ ও সুমহান ঐতিহ্য। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সাথে মহানবী (স.)-এর প্রতিটি আচরণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিরল ও  প্রোজ্জ্ব¡ল দৃষ্টান্ত।

শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম ইসলাম মানবজাতির পারস্পরিক সামাজিক সুসম্পর্ক বজায় রাখার ওপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। সামাজিক জীব হিসেবে মানবসমাজে বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও গ্রাম-মহল্লার লোকজনের সঙ্গে সমাজবদ্ধ হয়ে মিলেমিশে বসবাস করে। তাই সমাজ জীবনে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে হলে সমাজের সব সম্প্রদায় ও ধর্মাবলম্বী ব্যক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। দৈনন্দিন জীবনে আয়-উপার্জন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান প্রভৃতি থেকে শুরু করে মৃত্যুর পর কাফন-দাফন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। মানবধর্মই তো মানুষের মনুষ্যত্ব। মানুষকে তার ধর্ম তথা মনুষ্যত্ব থেকে দূর করলে সে অমানুষ হয়ে যায়। তাই সর্বধর্মের মাহামিলনকামী বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় নির্ভীকচিত্তে লিখেছেন, ‘গাহি সাম্যের গান/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান/ যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-খ্রিষ্টান।’

মানুষের মধ্যে যেসব গুণাবলি থাকলে মানুষকে মানুষ বলা যায় এবং না থাকলে আর মানুষ বলা যায় না, সেসব গুণাবলিই মানুষের ধর্ম। সব ধর্মীয় বিধিবিধান ও আচার-অনুষ্ঠান মানবকল্যাণে এবং মানুষকে সত্য-সুন্দর ও সুখ-শান্তির দিক-দর্শন প্রদানে নিয়োজিত। তাই পৃথিবীর সব কটি প্রধান ধর্মের প্রচারকেরা মহান সৃষ্টিকর্তার প্রেরিত মহামানব হয়েও সদা মানবকল্যাণে নিয়োজিত ছিলেন। তাই বিশ্বব্যাপী আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি একান্ত প্রয়োজন।

অনেকে মনে করেন সাম্প্রদায়িকতা মানে প্রতিদিন সংখ্যালঘু নিযার্তন বা সংখ্যালঘুর উপর হামলা করা। কিন্তু তারা এটা ভুলে যান যে মানসিক নির্যাতনও এর মধ্যে পড়ে। আমি মনে করি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশের সংখ্যালঘু অমুসলিম নাগরিকদের জানমাল, ইজ্জতের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা ও নাগরিকদের আইনি অধিকার সংরক্ষণে সবাইকে মানবতার কল্যাণে একসঙ্গে কাজ করতে বদ্ধপরিকর হতে হবে।  

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল ও চেয়ারম্যান বাংলাদেশ মিডিয়া এন্ড ম্যানেজম্যন্ট ট্রেনিং ইনিস্টিটিউট।



 


আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
২০ জানুয়ারি ২০১৮
বিত্রমটি আই নিউজ ডেস্ক
একটা নদী উপহার পেয়েছি রটনার মত ছড়িয়ে যাচ্ছে , গুজব না সত্যি ! আমার একটা নদী আছে যদিও আমি নদী চাইনি চেয়েছি চাঁদ , তবু নদীই পেলাম বিস্তারিত
২০ জানুয়ারি ২০১৮
বিত্রমটি আই নিউজ ডেস্ক
আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের এক গৃহবধু দেবর ও ভাশুরের নির্যাতন, হয়রানিমূলক মামলাসহ বিভিন্ন কুৎসার হাত থেকে নিজের পরিবারের সদস্যদের বাঁচাতে সংবাদ সম্মেলন বিস্তারিত
২০ জানুয়ারি ২০১৮
বিত্রমটি আই নিউজ ডেস্ক
ড্রিম ডিভাইজারের নিজস্ব উদ্ভাবিত স্বপ্ন- সুশিক্ষা- সুযোগ মডেলে সুশিক্ষায় স্বপ্নবুননে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে। সুশিক্ষায় স্বপ্নবুননে বিশেষ আয়োজন হচ্ছে স্বপ্ন-আড্ডা। স্বপ্ন আড্ডার বিস্তারিত
© স্বত্ব বিএমটিআইনিউজ ২০১৫ - ২০১৭
সম্পাদক :
মিঞা মুজিবুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক : শাহআলম শুভ
৩৭৩,দিলু রোড (তৃতীয় তলা)মগবাজার, ঢাকা-১২১৭
ফোন: ০২৯৩৪৯৩৭৩, ০১৯৩৫ ২২৬০৯৮
ইমেইল:bmtinews@gamil.com